Read the English version here.

৫ আগস্ট, ২০২৪। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক যুগান্তকারী ঘটনার দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি দিনটিতে রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। ১৫ বছরের বেশি সময় দাপটের সঙ্গে শাসন করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাধ্য হন বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে পালিয়ে করতে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানকে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানোর নজির তৈরি হলো।

দেশ ছাড়ার আগে হাসিনা সরকার যে দমন-পীড়ন চালিয়েছে, তা ভয়াবহ। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (UN OHCHR) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়। আহতের সংখ্যা হাজার হাজার, যাদের অনেককে গুলি করেছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী। নিহতের ১২-১৩ শতাংশই শিশু। প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী ঘটিয়েছে সরকারের নির্দেশে।

Photo Courtesy: Jibon Ahmed

কোটাপ্রথা ও দায়মুক্তির ছায়ায়

গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা ২০২৪ সালের জুন মাসে। শুরুটা ছিলো সরকারের এক সিদ্ধান্তে। সরকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা পূনর্বহাল করে। ছাত্ররা এই নীতি ব্যাপকভাবে নিন্দা করে এবং একে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য হিসেবে অভিহিত করে। তাদের দাবি, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে একটা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধাভোগীতে পরিণত করেছে। আর সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে সাধারণ তরুণদের। 

আন্দোলনের পেছনে ছিল উচ্চ আদালতের এক রায়। সেই রায়ে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে পুরাতন ব‌্যবস্থা নতুন করে চালু হয়, যেখানে ৫৬ শতাংশ সরকারি পদই সংরক্ষিত থাকে বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য। তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনির জন্য ৩০ শতাংশ কোটা।

ছাত্ররা বিষয়টিকে অসাধু নীতি হিশেবেই ধরে নেয়; এই কোটা ব্যবহৃত হয় আওয়ামীপন্থী ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এমন ধারণাও ছিলো সমাজে। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ব‌্যবহার করা হয় রাজনৈতিক স্বার্থে। এর প্রতিক্রিয়ায় বৈষম‌্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব‌্যানারে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে পুনরায়। উদ্দেশ‌্য ছিল সবার জন‌্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

শুরু থেকেই আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। আওয়ামীলীগের এই ছাত্র সংগঠনটি বিরোধী মত রুদ্ধ করার কারণে কুখ্যাত। এরপর আসে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম দমন অভিযান। হাজার হাজার মানুষ আহত হন। বিনা কারণে গ্রেপ্তার করা হয় বহু শিক্ষার্থীকে। আন্দোলনের শেষ দিকে মৃত্যুর সংখ্যা যা দাঁড়ায়, তা রীতিমত ভয়াবহ। অনেকে সেই মৃত‌্যুর সংখ‌্যাকে বর্ণনা করেছে ‘মৃত্যুর পাহাড়’ হিসেবে।

Photo Courtesy: Jibon Ahmed

তবে রাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়নের ফল হয় বিপরীত। আন্দোলন আরও অপ্রতিরোধ‌্য ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল কেবল কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে, তা নেমে আসে একটি মাত্র দাবিতে, শেখ হাসিনার পদত‌্যাগ। 

২০২৪ সালের ৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ উচ্চ আদালতের রায় বহাল রাখে, যা আন্দোলনে নতুন গতি আনে। প্রতিবাদ যত তীব্র হতে থাকলো, তত বাড়তে থাকলো সরকারের দমননীতি। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে অত্র অঞ্চলে বন্ধ করে দেয়া হয় ৪জি মোবাইল ইন্টারনেট। ১৬ জুলাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় নেটওয়ার্কের গতি  ব‌্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়া হয়। এই পরিস্থিতি তীব্র করে তোলে জনরোষ। 

স্থানীয়ভাবে ‘শ্রাবণ বিদ্রোহ বা বর্ষা বিপ্লব’ নামে পরিচিত এ অভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার ভাঙন ও জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার দেশত‌্যাগের পর আদালত জুলাই ও আগস্টের ঘটনার ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও আরও দুজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রতিশ্রুতি দেয় সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন ২০০৯ সালে। তখন থেকেই তার শাসনকাল দফায় দফায় সমালোচিত হয়েছে ভিন্নমত দমন, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য। দীর্ঘদিন ধরে তার সরকারের সেন্সরশিপ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও দায়মুক্তি সংস্কৃতির নিন্দা করে আসছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

একটা ভিডিও বদলে দিল সব

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাল্টে যায় আন্দোলনের গতি। সেদিন একটি ভিডিওতে ধরা পড়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য। তিনি কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ‌্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিও। সেখানে দেখা যায়, এক নিরস্ত্র তরুণ পাখির মতো দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ তার দিকে গুলি ছোড়ে। কয়েক সেকেন্ড পর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মৃত‌্যুবরণ করেন অল্প সময় পরেই।

মর্মান্তিক এ ভিডিও মুহূর্তে যেন দেশজুড়ে শোকের মাতম তৈরি করে। আমূল বদলে দেয় আন্দোলনের গতিপথ। প্রথমে যা ছিল অন্যায় কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তা মুহূর্তেই রূপ নেয় দেশব‌্যাপী নৈতিক জাগরণে। ক‌্যামেরায় ধারণ করা এ নগ্ন সহিংসতা মানুষের সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে; সম্পৃক্ত করে ছাত্র আন্দোলনের বাইরে থাকা অসংখ্য মানুষকেও।

যতই জনসমর্থন বাড়তে থাকে; আরও বেশি ছাত্র নামতে থাকে রাস্তায়। হাসিনা সরকারের জন্য আন্দোলন দমন ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। গুলি, মারধর এবং সরকারপন্থী বাহিনীর হামলা সত্ত্বেও জনরোষ থামানো যায়নি; বরং কেবল বেড়েই চলেছে। 

 Photo Courtesy: Kazi Oyali Ullah

ইন্টারনেট বন্ধের দিনগুলোয় তথ‌্য সংরক্ষণ

প্রতিবাদ তীব্র আকার ধারণ করলে শেখ হাসিনার সরকার ১৭ জুলাই রাতেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় এগিয়ে যায় আরেক ধাপ। ১৮ জুলাই রাত থেকে সারাদেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ডসহ সব ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে দেশ কার্যত তথ্যবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সরকারের এ পদক্ষেপ কেবল ডিজিটাল অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনই নয়, এর মধ‌্য দিয়ে দেশের ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ফ্রিল্যান্সিং এবং ই-কমার্সসহ অনলাইননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনে। সরকার দাবি করে, ইন্টারনেট বন্ধ হয়েছে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ডেটা সেন্টারে বিক্ষোভকারীদের হামলার কারণে। কিন্তু গ্রামীণফোনের মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনর নিশ্চিত করে যে এ শাটডাউন ঘটেছিল সরকারের নির্দেশে।

ইন্টারনেট ও সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা NetBlocks এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল অধিকার সংগঠন Activate Rights উভয়েই নিশ্চিত করেছে, এ ব্ল্যাকআউট ছিল পরিকল্পিত। উদ্দেশ্য ছিল দেশব‌্যাপী চলমান অভ‌্যুত্থানকে দমন করা। Activate Rights তাদের ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম Shutdown Watch-এ ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত দুইবার দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ থাকার বিষয় তুলে ধরেছে। এছাড়া তুলে ধরেছে আংশিক মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্লকসহ নানা ধরণের উদ্দেশ‌্যপ্রণোদিত শাটডাউনের ঘটনা।

Photo Courtesy: Shoeb Abdullah

ডিজিটাল ব্ল‌্যাকআউট থাকার পরও আন্দোলনকারীরা ছিলেন নাছোড়বান্দা। পুলিশ ও সরকারি বিভিন্ন দলের নিপীড়নে দেশব‌্যাপী হু হু করে বাড়তে থাকে শহিদের সংখ‌্যা। সরকারের উদ্দেশ‌্য ছিল সব ধরণের মিডিয়ার গলা টিপে ধরা, যেন জনগন ও বহির্বিশ্বের সামনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া রক্তপাতের খবর না পৌঁছয়। 

ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ দমন করতে সরকার ঝাঁপিয়ে পড়ে সকল বাহিনী নিয়ে। তার মধ‌্যে ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং অন্যান্য আধাসামরিক ইউনিট। দমনপীড়ন শুধু রাস্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; ব‌্যবহার করা হয়েছে আকাশপথও। হেলিকপ্টার থেকে ফেলা হয়েছে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস। এগুলোর লক্ষ্য করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জনসমাগমস্থল।

এমন আতঙ্ক আর নিষেধাজ্ঞার আবহে ছাত্র ও জনতা হাতিয়ার হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিল মোবাইল ফোনকে। সত্যকে সংরক্ষণ করে রাখার জন‌্য শেষ অবলম্বন। মূলধারার গণমাধ্যম তখন কঠোরভাবে সেন্সরশিপের কবলে; ইন্টারনেট বন্ধ। ফলে তারা বুঝেছিল, সরাসরি তোলা ফুটেজই হতে পারে আন্দোলনের কণ্ঠস্বর।

ইন্টারনেট ছাড়াই মানুষ ধারণ করেছে দমন-পীড়নের দৃশ্য, সেগুলো জমা রেখেছে ব্যক্তিগত ডিভাইসে। কেউ কেউ তো কেবল ভিডিও ধারণের অপরাধেই গ্রেপ্তার হয়েছে। তবু তারা থামেনি।

জুলাই গণ-অভ‌্যুত্থানে অংশ নেয়া ছাত্রনেতা হাসান Activate Rights-কে বলেন-
‘আমরা জানতাম যে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপের কারণে আমাদের কথাগুলো হারিয়ে যেতে পারে। তাই তখন আমাদের সঙ্গে যা ঘটছিল, তা নিজেরাই ভিডিওতে ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিই। যেন বিশ্বকে দেখাতে এবং ন্যায়বিচার চাইতে পারি। বিক্ষোভ চলাকালে যখন নিরাপত্তা বাহিনী প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করছিল, তখন সেগুলো ধারণ করার চেষ্টা করতাম এবং বাড়িতে সুরক্ষিত রাখতাম। প্রায়ই এসএমএস পাঠিয়ে সহযোদ্ধাদের বলতাম, চারপাশে পুলিশের বর্বরতা ও ছাত্রলীগের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিডিও যেন সংরক্ষণ করা হয়।’

মোবাইলের সে ভিডিওগুলো পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ‌্য দিয়ে ধরা পড়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিনা উসকানিতে গুলি করা এবং আওয়ামীপন্থী সন্ত্রাসীদের সহিংস হামলার দৃশ‌্য। সে ফুটেজগুলোই স্পষ্ট করে দেয় একটা রাষ্ট্রের দানবীয় চিত্র, যে কিনা তরুণদের বিচার ও সংস্কারের দাবিকে রুদ্ধ করতে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করেছে।

ইন্টারনেট দখল ও বিকল্পের সন্ধানে

মূলধারার গণমাধ্যমের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে সামাজিক মাধ্যমই হয়ে উঠেছিল জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন কালীন প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। তাৎক্ষণিক আপডেট দেওয়া, মোবিলাইজেশন কার্যক্রম সংগঠিত করা, বক্তৃতা প্রচার করা এবং গ্রাউণ্ড রিপোর্ট প্রদান ও  সাধারণ জনগণের কাছে খবরাখবর পৌছে দেয়ার জন্য ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম [যিনি পরে অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেন এবং বর্তমানে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন] অ্যাক্টিভেট রাইটস-এর সঙ্গে আলাপে ডিজিটাল দমননীতি সম্পর্কে বলেন:

“ইন্টারনেট বন্ধ করার মাধ্যমে  তথ্য প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকার এটা করে, যাতে মানুষ একত্রিত হয়ে সংগঠিত হতে না পারে। একইসাথে, এটা ছিলো নজরদারিরও একটা কৌশল, যা আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইন্টারনেট ছাড়া সংগঠকেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, আর আন্দোলনকারীরা রাস্তায় কী ঘটছে তা জানতে বা শেয়ার করতে পারছিল না। এর ফলে আমরা প্রায়ই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতাম।”

নাহিদের বিশ্বাস, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া ছিল পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের অংশ। তাঁর মতে, সরকার সহিংসতার ব্যাপকতা আড়াল করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, আর ঠিক সেই কারণেই সংগঠকেরা (ইন্টারনেট বন্ধ থাকাকালে) মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহকে অগ্রাধিকার প্রদান করেছিল।কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ছাত্র ও সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ কার্যক্রম চালিয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, যেমন মেশ নেটওয়ার্ক অ্যাপ Briar ও Brigify নির্মাণ। কিছু ক্ষেত্রে ছাত্ররা ‘যোগাযোগ’ নামক স্বাধীন সার্ভার তৈরি করার চেষ্টা করে। তবে বিকেন্দ্রায়িত যোগাযোগের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো না থাকায় এসব প্রচেষ্টা শুরুতেই বহুবিধ সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় ভিপিএন ব্যবহারের হার বেড়ে যায়, কারণ মানুষ যেকোনোভাবে সংযুক্ত ও ইনফর্মড থাকতে চাইছিল। এই ব্ল্যাকআউট সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রীভূত ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে দেয় এবং বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, উন্মুক্ত ও বিকেন্দ্রীভূত ইন্টারনেট অবকাঠামোর জরুরি প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তোলে এবং একইসাথে, জুলাই আন্দোলন বিকল্প যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদও জানায়।

ফুটেজ থেকে জবাবদিহিতা

২৩ জুলাই রাতে আংশিকভাবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ ফিরলেও মোবাইল ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ২৮ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ছিল। পুরো ব্ল্যাকআউট জুড়ে সরকার সহিংসতার দায় চাপিয়েছিল ছাত্রদের ওপর। অস্বীকার করেছিল অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ। চেষ্টা করেছিল নিহতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন রাখতে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোও সরকারের বক্তব্যই প্রচার করেছে। এমন বয়ান তৈরি করেছে যেখানে ছিল আন্দোলনকারীদের সহিংস আর রাষ্ট্রকে সংযমী রূপে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।

Photo Courtesy: Shoeb Abdullah

কিন্তু এই বয়ান ভেঙে পড়তে শুরু করে ব্ল্যাকআউটের মাত্র পাঁচ দিন পর। আংশিকভাবে তখন ফিরে এসেছিল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। সেই সময় ছাত্র ও সাধারণ মানুষ মোবাইলে ধারণ করা তাদের উপর নিপীড়নের ভিডিওগুলো আপলোড করতে শুরু করে। ফুটে উঠে রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত ভয়াবহ সহিংসতার চিত্র। পূর্ণ ব্ল্যাকআউটের সময় ধারণ করা সম্পাদনাহীন ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোপুরি ভেঙে দেয় সরকারের মিথ্যাকে। সরকার যে গল্পের মধ‌্য দিয়ে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল, তার সেই বয়ান অলঙ্ঘনীয় প্রমাণের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে।

বহু ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ খুব কাছ থেকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের দিকে একের পর এক গুলি ছুঁড়ছে। অথচ তাদের দিক থেকে কোনো হুমকি ছিল না। এক বিশেষ ভিডিওতে দেখা যায়, বাংলাদেশ পুলিশ এক আহত ছাত্রকে সাঁজোয়া যান থেকে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে। পরে জানা যায়, ওই ছাত্রের নাম শেখ ইয়ামিন। সে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী। তাকে রাস্তায় ফেলে রাখা হয় মৃত্যুর মুখে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি নির্মাণাধীন ভবনের রডে ঝুলে আছে এক তরুণ। দূর থেকে ধারণ করা ওই ফুটেজে ধরা পড়ে দুই পুলিশ সদস্য এগিয়ে এসে অন্তত ছয় রাউন্ড গুলি চালায় সেই তরুণের দিকে, যে সেখানে লুকিয়ে ছিল।

তৃতীয় এক ক্লিপে দেখা যায়, ঢাকার একটি ফুটব্রিজের কাছে কয়েকজন পুলিশ একত্রে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই এক যুবক গুলিবিদ্ধ আরেকজনকে বাঁচাতে তাকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছে। এমন সময় পুলিশ আরও তিন রাউন্ড গুলি চালায় নিরস্ত্র লোকদের দিকে। আহত যুবক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে আসা ব্যক্তি বাধ‌্য হয় প্রাণভয়ে পালাতে।

যুবক আন্দোলনকারীরা ভিডিওগুলো দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। এর মধ‌্য দিয়ে দ্রুত ভেঙে যায় সরকারের প্রোপাগান্ডা। যারা এতদিন ঘরে ছিল, তাদের জন্য ফুটেজগুলো ছিল এক ধরনের অনুঘটক। তারা নতুন উদ্যম ও ঐক্য নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে উদ্ধুদ্ধ হয়।

জনসাধারণের ধারণ করা ভিডিও ও ব্ল্যাকআউট চলাকালীন হতাহতের তথ্য পর্যালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব‌্যবহার করেছে; যার মধ্যে ছিল গুলি, টিয়ার গ্যাস ও শটগান ব্যবহার। আর এ সব করেছে মূলত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করার জন্য।

এই সময়ে আন্দোলন পৌঁছায় এক বাঁক পরিবর্তন কারী মুহূর্তে। ছাত্ররা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, তাদের দাবি এখন আর কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এখন এক দফায় উপনীত হয়েছে। হত্যাযজ্ঞের পর তারা শুধু সরকারের পদত্যাগই নয়, বরং অপরাধীদের বিচারেরও দাবি তোলে।

WITNESS-এর ভূমিকা: রেকর্ড করার হক

১৯৯২ সাল থেকে WITNESS বিশ্ব জুড়ে Right to Record অর্থাৎ পুলিশ, সামরিক বাহিনী ও সরকারি কর্মকাণ্ড নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণের পক্ষে কাজ করে আসছে। এক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক যেন কোনোপ্রকার ভয় ছাড়াই ঘটনার প্রমাণ রাখতে পারেন। এই অধিকার ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার একটি মূলভিত্তি, বিশেষত দমন-পীড়ন ও সংঘাতের সময়গুলোয়।

বাংলাদেশে WITNESS ২০২৪ সালের শুরু থেকে দেশীয় কর্মী ও ডিজিটাল অধিকার-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে তারা নানা সহায়তামূলক উপকরণ দিচ্ছে। যেমন-

  1. বাংলাদেশে বিক্ষোভ, পুলিশ ও সামরিক সহিংসতাকে ধারণ করার টিপস
  2. বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী অপরাধ ধারণ করার টিপস

বিষয়গুলো আন্দোলনের সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছাত্র ও জনতাকে ব‌্যাপকভাবে সহযোগিতা করেছে নিরাপদ ও নৈতিকভাবে প্রমাণ ধারণ ও সংরক্ষণ করতে।

শৈল্পিক অ্যাক্টিভিজমের হাতিয়ার প্রতিবাদী ভিডিও

যখন সীমিত গতিতে আংশিকভাবে ইন্টারনেট ফিরে আসে, তখনই অনলাইনে ভেসে উঠতে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভিডিও। এই বেদনাদায়ক ফুটেজের স্রোতের পাশাপাশি শিল্পী ও সংগীতশিল্পীরাও যুক্ত হন প্রতিরোধের ঢেউয়ে। ডিজিটাল দলিলকে রূপ দেন শৈল্পিক অ্যাক্টিভিজমে।

এর অন্যতম শক্তিশালী উদাহরণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত র‌্যাপার হান্নান হোসেন শিমুল। তিনি পুলিশি নির্যাতনের চরম সময়ে ইউটিউবে প্রকাশ করেন তার সাড়া জাগানো প্রতিবাদী গান ‘আওয়াজ উডা’। বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের ছন্দে বাঁধা এ গান দ্রুতই বাংলাদেশের ইউটিউবে ট্রেন্ডিং হতে থাকে। পরিণত হয় আন্দোলনের স্লোগানে। তবে ২৫ জুলাই হাসিনা সরকারের পুলিশ শিমুলকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তৈরি বহু প্রতিবাদী গান ও র‌্যাপের মতো আওয়াজ উডাও তৈরি হয়েছে বাস্তব আন্দোলনের ফুটেজ ব্যবহার করে। সঙ্গীতের তালে ধরা পড়েছে মানুষের প্রতিরোধ, পুলিশি নির্যাতন এবং অবিচল সংহতির দৃশ্য। গানের কথায় প্রতিফলিত হয়েছে মানুষের সাহস ও দৃঢ়তা। কেবল শৈল্পিক প্রকাশ নয়, আন্দোলনের জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল।

প্রতিবাদী সঙ্গীতগুলো আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কেবল আন্দোলনকারীদের মনোবলই বাড়ায়নি, বরং যুক্ত করেছে আরও অনেক শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও লেখককে। শিল্প, অ্যাক্টিভিজম এবং ভিডিও প্রমাণের এ মিলন আন্দোলনকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা একীভূত হয়ে জোরালো করে তুলেছিল ন্যায়বিচারের আহবানকে। 

যে মিউজিক ভিডিওগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে বাস্তব প্রতিরোধের দৃশ্যের সাথে মিশে গিয়েছিল কাব্যিক পঙক্তি ও তীক্ষ্ম গানের কথা। যেখানে ফুটে উঠে এক নির্ভীক তরুণ প্রজন্মের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠার আখ‌্যান। এর মাধ্যমে আন্দোলনের গতি টিকে থেকেছে, বিশেষত সেই মুহূর্তগুলোয়, যখন সরাসরি প্রতিবাদ সহিংসতা ও দমন করা হচ্ছিল তীব্রভাবে।

সত্যের সুরক্ষা: বাংলাদেশ প্রোটেস্ট আর্কাইভ

আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে তরুণ ও সাধারণ মানুষ এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তারা চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ব্যাপক সহিংসতাকে রেকর্ড করতে থাকেন। রেকর্ডগুলো নিরাপদে সংরক্ষণের লক্ষ্যে WITNESS ও Activate Rights মিলে চালু করে বাংলাদেশ প্রোটেস্ট আর্কাইভ (BPA)। প্লাটফর্মটি বিশেষভাবে নিবেদিত ঐতিহাসিক গণ-অভ‌্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং বিপুল সংখ্যক ভিডিও এভিডেন্স, অডিও ক্লিপ ও আলোকচিত্র সংরক্ষণের মধ‌্য দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য।

আর্কাইভটির মূল লক্ষ্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা, যাতে সেগুলো সেন্সরশিপ বা বিকৃতির কবলে না পড়ে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ায়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে BPA বর্তমানে সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী গণমাধ্যম নেত্র নিউজের সাথে কাজ করছে, যাতে ঘটনাগুলো মামলাভিত্তিকভাবে তদন্ত করা যায় এবং সহিংসতা ও দমন-পীড়নের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা যায়।

 

বাংলাদেশ প্রোটেস্ট আর্কাইভ একা নয়। হাসিনা সরকারের পতনের পর আরও বহু কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ গড়ে উঠেছে, যারা জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত নৃশংসতার প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে মনোনিবেশ করেছে।

জুলাই রেভলিউশনারি অ্যালায়েন্স, রেড জুলাই, রিলায়েবল টেলস, জুলাই ম্যাসাকার আর্কাইভ এবং টেলস অব জুলাইয়ের মতো বহু সংগঠন গড়ে উঠেছে আন্দোলনকারী, শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে। এগুলোর লক্ষ‌্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও সাক্ষ‌্য সংরক্ষণ করা। এদের অনেকেরই আনুষ্ঠানিক আর্কাইভ প্রশিক্ষণ বা পদ্ধতিগত ধারণা নেই, তবু তাদের অবদান অপরিমেয়। তারা প্রমাণ সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছেন। নিশ্চিত করছেন যেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সত্যটুকু মুছে না যায়।

আর্কাইভগুলো গড়ে উঠেছে সম্মিলিত স্মৃতি ও তৃণমূল প্রচেষ্টার ভিত্তিতে। এ এক নতুন ধরণের ন্যায়বিচার-প্রত‌্যাশী আন্দোলন। এ আন্দোলন বিকেন্দ্রীভূত, জনতা-নির্ভর এবং স্মৃতি রক্ষার সাহসে পরিচালিত।

ফুটেজ টিকে গেছে, ন্যায়বিচার? 

ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের সময় সংঘটিত নৃশংসতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও, অনেক ফুটেজ এখনো যাচাইবিহীন ও দুর্বলভাবে সংরক্ষিত। অবস্থান, সময় এবং ব্যক্তির পরিচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মেটাডেটা প্রায়ই অনুপস্থিত বা অস্পষ্ট থাকে। এর ফলে শুধু আইনি জবাবদিহির প্রচেষ্টাই জটিল হয় না, বরং ভিডিওর বিশ্বাসযোগ্যতাও কমে যায় সংবাদমাধ্যম ও জনপরিসরে।

আন্দোলনের শুরু থেকেই পুলিশি সহিংসতা ও হামলার ভিডিও প্রমাণ বিশ্লেষণ করছেন এএফপি বাংলাদেশের সাবেক ফ্যাক্টচেক সম্পাদক বর্তমানে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টের এডিটর কদরুদ্দিন শিশির। তিনি অ্যাক্টিভেট রাইটসকে বলেন-

‘অনেক ভিডিও বিশ্লেষণ করা যায়নি। ফলে হামলাকারী ও ঘটনার স্থান চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটা হত্যাকাণ্ডে ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া আসল ভিডিওকে ভুয়া বলা হচ্ছে, আবার ভুয়া ভিডিওও ছড়ানো হচ্ছে। এগুলো সঠিকভাবে যাচাই না হলে বিচার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।’

শুধু আইনি ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নয়, যাচাইবিহীন ভিডিও নিউজরুমে অবিশ্বাসের শিকার হতে পারে, সাধারণ মানুষের কাছে বাতিল হতে পারে অথবা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। বিষয়গুলো সত্য উন্মোচন ও সম্মিলিত স্মৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকার যখন আন্দোলনের ইতিহাস মুছে ফেলতে বা বিকৃত করতে উদ্যত, তখন জনগণের ধারণ করা ফুটেজের সত‌্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু আদালতের জন্য নয়, সত্যের জন্যও।

এই কারণেই বহু ডিজিটাল অনুসন্ধানকারী ও আর্কাইভকর্মী কার্যকর ও পদ্ধতিগত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। এটি কেবল আদালতের প্রমাণ নয়, এটি সাংবাদিক, শিক্ষক, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং আন্দোলন নিজস্ব ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়। WITNESS দেশীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যাচাই-বাছাই ও আর্কাইভ সক্ষমতা গড়ে তুলতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে নথিপত্র হয় নিরাপদ, নৈতিক ও প্রামাণিক মানসম্পন্ন।

সম্মিলিত ধারণ, সম্মিলিত সংরক্ষণ

বর্ষা বিপ্লবের পর বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস। এ সরকারের মধ্যে ছাত্র প্রতিনিধি রয়েছে, যা প্রতিফলিত করে তৃণমূলে থাকা বিপ্লবের চেতনাকে। দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে, নতুন সরকার আগের আমলে সংঘটিত অপরাধে দায়ীদের বিচার করবে।

তবে, অভ‌্যুত্থানের এক বছর পরও ন্যায়বিচারের অনেকটাই নির্ভর করছে ভিজ্যুয়াল প্রমাণের মান, সততা এবং সংরক্ষণের উপর। মানবাধিকার লঙ্ঘনের যথাযথভাবে সংরক্ষিত ও যাচাই করা দলিল না থাকলে দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

ন্যায়বিচারের পথ দীর্ঘ। কিন্তু সংগঠিত সংরক্ষণ, বিশ্বাসযোগ্য যাচাই এবং বৈশ্বিক একতার মাধ্যমে, ক্যামেরায় ধারণ করা সত্য বাস্তব জবাবদিহিতায় পৌঁছতে পারে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে WITNESS বাংলাদেশি কর্মী ও কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করে চলছে। সত‌্যকে নথিভুক্ত করার অধিকারকে শক্তিশালী করতে, ভিডিও বাছাইয়ের দক্ষতাকে দৃঢ় করতে এবং জনতার ফুটেজকে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে রক্ষায় সহায়তা করতে।

শোয়েব আব্দুল্লাহ বাংলাদেশের একজন ডিজিটাল রাইটস এক্টিভিস্ট। তার আগ্রহের বিষয়  অনলাইন পরিসরে স্বাধীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিজয়াল আর্কাইভ। শোয়েব ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যাক্টিভেট রাইটস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা প্রযুক্তি ও জবাবদিহিতার সংযোগস্থলে কাজ করে । এছাড়া তিনি বাংলাদেশ প্রোটেস্ট আর্কাইভ-এরও সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা ২০২৪ সালের জুলাই বিদ্রোহ চলাকালে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথিপত্র সংরক্ষণ ও প্রামাণ্য দলিল তৈরিতে নিবেদিত। এই আর্কাইভের মাধ্যমে তিনি কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলোকে সহায়তা করেন, যাতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও নাগরিক প্রতিরোধের প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে।

শোয়েবের কাজের পরিধি অধিকার রক্ষার লড়াই থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপেন-সোর্স ইনভেস্টিগেশন। তিনি বর্তমানে একাধিক অনুসন্ধানী সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার অপরাধীদের শনাক্ত করতে এবং বাংলাদেশের জন্য রূপান্তরমূলক ন্যায়বিচারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *